নিশা

Posted: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১
Category: গল্প
By:


নিশা চলে যাওয়ার পর আমার তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। খাওয়া-দাওয়া আগের মতো চলছে, ঘুম আগের চেয়েও দীর্ঘ হয়েছে। বাইরে যাওয়া, অফিস, স্বাভাবিক কাজকর্ম আগের মতোই চলছে। কোথাও কোনো ছেদ নেই। কেবল, একটা ঘটনা ছাড়া। আমার সব কথা ফুরিয়ে গেছে। আগের মতো বলে যেতে পারি না। যতটুকুই বলি, পেঁচিয়ে যায়। আর বলবই বা কার সঙ্গে? প্রতিদিন অফিস ছাড়া নিয়মিত আর কোথাও, কারো কাছে যাওয়া হয় না। তাই কথা বলার প্রয়োজন পড়ে না তেমন।

তবু সমস্যায় পড়েছি। অফিসে একটা প্রেজেন্টেশনের মাঝে কথা হারিয়ে ফেললাম। কপালে ঘাম জমে গেল। পাড়ার দোকান থেকে আলু আর পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে অনেকক্ষণ ‘আলু’ শব্দটা মনে পড়ল না। বস্তায় রাখা আলু দেখিয়ে দোকানিকে বললাম, ‘এক কেজি দ্যান’। সিএনজিওয়ালাকে ফুলার রোডের নাম মনে করে বলতে বলতে সে আরেকজনকে নিয়ে চলে গেল।

মেয়েরাই নাকি বেশি কথা বলে স্বামীকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু, আমাদের ছিল উল্টো। এত দ্রুত ‘ছিল’ বলছি বলে নিজেই একটু অবাক হচ্ছি। কিন্তু এটা তো সত্যি, সে চলে গেছে। আমিই কথা বলতাম, সে শুনত বেশি। মুখে উত্তরও তেমন একটা দিত না। শুধু চোখ দেখে বুঝতাম মন দিয়ে শুনছে। কাজকর্ম করার সময়ও সাড়াশব্দ কম হতো। চায়ের কাপ আমার হাতে দিতে দিতে কিংবা আমার শার্টের একটা বোতাম সেলাই করতে করতে কিংবা একটা বই পড়তে পড়তে মন দিয়ে আমার কথা শুনত। মাঝে মাঝে মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসত। কথা কম বললেও কখনো কখনো নিশা খুব সুন্দর হাসত। খুব প্রাণবন্ত। ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলতাম, ‘অড্রে হেপবার্নের আর কী হাসি! হাসি হলো আমার বউয়ের!’ তাতে সে হাসি জলতরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ত। টিভি দেখার অভ্যাস ওর ছিল না। তবে ছক্কা কিংবা পেনাল্টি শুটআউটে আমি লাফিয়ে উঠলে সে খুব আনন্দ পেত।

সেই নিশা আমাকে ছেড়ে গেল। কারণ বলল না। না বললেও কিছু দিন ধরে একটা আশঙ্কায় ছিলাম। সেটা ঘটে গেল শুক্রবার। সকালে ও আগে উঠেছিল। নাশতা তৈরি করে অপেক্ষা করছিল আমি কখন উঠব। ওঠার পর দু’জন একসঙ্গে নাশতা করে চা খেলাম। চা শেষ করে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ‘যাচ্ছি’ বলে নিশা বেরিয়ে গেল। সে মুহূর্তটা মনে পড়ে। একটা কাক কা কা করছিল, পাশের রাস্তায় গাড়ির ভেঁপু শোনা যাচ্ছিল। সবকিছু খুবই স্বাভাবিক। যেন হরদম এমন ঘটে।

এরপর তিন সপ্তাহ হলো। মনেই ছিল না, নিশা আমার জীবনে এসেছিলও হঠাৎ করে। বিয়ে করব, এমন ভাবনা ছিল না। আমার বন্ধু ফারহানের বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে গিয়েছিলাম। সেপ্টেম্বরের বাইশ তারিখ, সকাল সাড়ে দশটায় শেওড়াপাড়ায় কাজী অফিসে হাজির হয়ে দেখি মেয়েটা ছাড়া কেউ আসেনি। দশটার মধ্যে আরো দু’জনকে নিয়ে ফারহানের আসার কথা ছিল। সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। সে আসে না। মেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে একবারে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে এসেছে। সঙ্গে কেউ নেই। তার ফোন থেকে কল দিয়ে ফারহানকে পাওয়া গেল না। বারোটার দিকে ফারহান আমার ফোনে কল দিয়ে বলল, ‘দোস্ত, একটা ভুল হয়ে গেছে। আমি আসতে পারছি না।’ আমি বললাম, ‘আসতে পারছি না মানে কী?’ ফরহাদ অধৈর্য্য হয়ে বলল, ‘তুই প্লিজ নিশাকে বুঝিয়ে বল।’ আমি বললাম, ‘তুই কথা বল।’ ফারহান বলল, ‘নাহ। নিশার চাচার সঙ্গে কথা হয়েছে, ওর একটা সমস্যা আছে।’ তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘..এক্সপ্লেইন করা সম্ভব না। তুই ওকে বলিস, আমি সরি।’ এরপর কোনো কথা না বলে সে ফোনটা রেখে দিল। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম মেয়েটাকে কীভাবে কথাটা বলব ভেবে। কিন্তু তাকে কিছু বলতে হলো না, সে ততক্ষণে বুঝতে পেরেছিল। আমার প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল। মেয়েটার গায়ে একটা সবুজ রঙের শাড়ি। লম্বা, পাতলা, শ্যামলা গড়নের, ভাসা ভাসা চোখ। সে চোখে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। তবে দেখলাম, অদ্ভুত সৌন্দর্য সেখানে।

এভাবেই নিশার সঙ্গে পরিচয়। আমাদের বিবাহিত জীবন ছিল সত্যিকার অর্থে আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়। আমার মতো মুখচোরা মানুষের এত কথা থাকতে পারে, নিশাকে না পেলে জানতাম না। ওকে সঙ্গে নিয়ে যা করতাম, তাই ভালো লাগত। অফিস শেষে হঠাৎ এসে বলতাম, ‘চলো ক্যাম্পাস যাই।’ নিশা মৃদু হাসত। আমরা শীতের রাতে ক্যাম্পাসে গিয়ে জারুলবাগানে হেঁটে, জরুচাচার দোকানে চা খেয়ে আবার রাতেই ফিরে আসতাম, রেললাইনে হাত ধরে হাঁটতাম, বৃষ্টিতে বাচ্চাদের মতো দৌড়াতাম। আমার মতো সামান্য মানুষের মধ্যে যে এমন রোমান্টিক কেউ লুকিয়ে আছে তা প্রথম জানলাম। পৃথিবী এত আনন্দের ছিল না আগে। সব কিছুতেই প্রচণ্ড আনন্দ। মা-বাবা ছাড়া বড়ো হয়েছিলাম। এই প্রথম মনে হয়েছিল, কিশোর হয়ে গেছি। আমার কথা যেন ফুরাতই না, আর সেসব কথা সে কি মন দিয়েই না শুনত! দু’বছর সাত মাস খুবই আনন্দে কেটেছে আমাদের। আমাদের? নিশার কথা জানি না, তবে আমার তো বটেই।

এর মধ্যেই এলো সেই অমোঘ দিন। নিশাকে প্রশ্ন করলাম, ‘ফারহান সেদিন কেন আসেনি?’ ও যেন বজ্রাহত। চোখে হঠাৎ বিস্ময়ের ঝলক, ধীরে ধীরে সেখানে অভিমান কিংবা ঘৃণার কালো ছায়া। মনে হলো, তার সামনে আমি নই অচেনা কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এরপর প্রশ্নটা আবার করিনি। তাছাড়া, ওর কাছ থেকে উত্তর পাওয়াও যেত না। ও এমনিতেই ছিল আশ্চর্যরকম নীরব। আর প্রশ্নটাও আসলে পেয়েছিলাম আরেকজনের কাছ থেকে। নিশার যে দূরসম্পর্কের চাচা ফারহানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ জানিয়েছিলেন, তিনিই আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। সেদিন তিনি আরো অনেক কথা সাবলীল ভঙ্গিতে বলেছিলেন। ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু মাথা থেকে তারকাঁটার মতো ফ্যাসফেসে গলা কিছুতেই নামাতে পারিনি, ‘শুধু ফারহান না… আরও দুইবার বিয়া ভাঙছে। কারণটা তারেই জিগায়েন। হে হে হে… বলবে না কেন, বলবে বলবে। আপনে হইলেন তার পরমাত্মীয়। স্বামী। আপনেকে বলবে না কাকে বলবে! বিবাহিত স্ত্রীর স্বামীর কাছে কিছু গোপন করা গুনাহ।’

নিজের যন্ত্রণার কাছে হেরে গিয়ে সাত দিন পর নিশাকে প্রশ্নটা করেই ফেলি। হয়তো, আমার অস্থিরতা দেখে কোনো গণ্ডগোল সে আন্দাজ করতে পেরেছিল। কিন্তু, তার মুখ দেখেই প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার করার সাহস হয়নি। সেখানে যে ছায়া নেমে এসেছিল, তা আর সরেনি।

তবে যেদিন নিশা চলে গেল সেদিন মনে হলো, তার ভেতরের সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ঝড় প্রশমিত। সিদ্ধান্তে পৌঁছালে মানুষের মুখে যে তৃপ্তি দেখা যায় সে প্রশান্তি তার মুখে। ওকে কিছুই বলতে পারলাম না। বলতে চাইলাম, ‘নিশা, আমার সবকিছু যেমন তোমার জানা উচিত, তেমনি তোমার সবকিছুও আমার…’ কথাগুলো নিজের কানেই অসার লাগায় শেষ করতে পারিনি। জানতাম, ওকে থামানো যাবে না। তবু কিছু বলতে চেষ্টা করলাম। মনে হলো, জিহ্বায় কেউ একটা কঠিন আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে। শেষমেষ শুধু ওর নাম ধরেই ডাকতে চাইলাম। তাও পারলাম না। তখন ঢাকা শহরের একটা কাক তারস্বরে ডাকছে, জোরে বেজে উঠছে গাড়ির ভেঁপু।

চোখের সামনে দিয়ে নিশা দরজা খুলে চলে গেল। সেই সঙ্গে আমার সমস্ত কথাও।


নুসরৎ নওরিন

গল্পকার, অনুবাদক ও প্রবন্ধিক

জন্ম: ১৬ এপ্রিল ১৯৮৬ সালে, মানিকগঞ্জ।
বাবার চাকরির সুবাদে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ সহ বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে শৈশব।
পড়ালেখা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর গল্প, অনুবাদ
প্রবন্ধ ও ফিচার একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিতব্য আছে একটি অনূদিত গ্রন্থ।
সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি প্রবন্ধ ও গল্পসংকলন। বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয়
দৈনিক পত্রিকার ইংরেজি অনলাইনে কর্মরত ছিলেন।
বর্তমানে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

শেয়ার করুন

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top
error: Content is protected !!