ধর্মবক ও অন্যান্য কবিতা

Posted: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১
Category: কবিতা
By:



১.
শীতকাল জাঁকিয়ে বসেছে, গরুগুলো স্যুয়েটার পড়ে সকালের
রোদে চিবুচ্ছে খড়। গরুর মালিক লোকটি গেঁয়ো আর
গোবেচারা। তাই চাইছি, শহরের কফিশপ থেকে কেউ ধোঁয়া
ওঠা কয়েক মগ গরম কফি এনে গরুদের দিক। আমি
শ্বাসকষ্টের রুগি নিবিড় জড়িয়ে যাচ্ছি ইনহেলার প্রেমে

পুচ্ছদোলানো পাখি খঞ্জনা। উঠোনের দাঁড়ে এসে বসেছে
চঞ্চল

রসবতি, হয়ে আছ কাঁটাময় খেজুরগাছের সারি…গাছির
হাড়িতে ভাঙছে রস

২.
সৈকতের বালিতে শুয়ে পড়েছি। এখন যা বলছি তা মন দিয়ে
শোন

ওই যে বিশাল ঢেউ আসছে, সে তার মাথায় তুলে আমাকে
নিয়ে যাবে গভীর সমুদ্রে

আবার একটি ঢেউ ফিরিয়ে দিয়ে যাবে

এর মধ্যে প্রায় দু’তিন ঘন্টা সময়, সেটা তোমার জন্য
শপিংমলে গিয়ে শপিং করার

৩.
জ্বর এলো বিকেলের দিকে। টেবিলে কাঁচের গ্লাসে পানি আর
পিরিচে আপেল

দেয়ালে হাঁটছে মোটা তক্ষক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো।
সিয়েরা লিওন আমি শুয়ে আছি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি বেঁধে
যায় সারবে কী সামান্য প্যারাসিটামলে!

ডাক্তার আসেনি আজ। আগামি সকালে যদি আসেন তো
উত্তর জানবো নিশ্চয়

৪.
গাছ থেকে গাছের দূরত্ব স্বাস্থ্যকর। এবং খুব আশ্চর্য, দূরত্ব
থাকা পরও গাছ থেকে গাছে প্রেম ভালোবাসা যৌনতা
প্রবাহিত হয়

লোকটি উন্মাদ-মজনু প্রায়। লাইলি ওর অন্য ঘরের বউ।
তারপরও লোকজন ধরে ধরে বলছে সে, গাছের নিয়মে
লাইলির গর্ভে তার নিজের সন্তান

৫.
একটি কমলালেবু ছুঁড়ে দিয়েছিলে। ছেলেটির হাতে গিয়ে
পড়ল যখন;তখন তা মস্ত এক এর্যোিড্রাম। ছেলেটিকে নিয়ে
ভেসে যাচ্ছে হাওয়ায়

সে তো প্রায় কয়েক যুগ আগের কথা

দূরবীনে চোখ রাখি। দেখি, এখনো মহাশূন্যে ভেসে যাচ্ছে
ছেলেটি। ওর হাসি মুখ, হাত নেড়ে আমাকে বাই বাই বলছে

৬.
এক একটি শ্বাসকষ্টের দিনে চা-এ তুলসিপাতা মিশিয়ে খাচ্ছি।
আর ভাবছি, তুলসিগাছ হিন্দুবাড়ির গাছ

গাছের জগতে তাহলে তুলসিগাছ হিন্দু-ই!

এই কাঠুরে-মুলুকে সব আহম্মক কাঁ হে কাঁ!না হলে কে
ভাবছে, তুলসির পুরুষাঙ্গ ছেঁটে তাকে মধ্যবর্তী বানাতে

৭.
বাঘের শরীর থেকে ডোরাকাটা দাগগুলো ঝরে গিয়ে সাপ হয়ে
গেছে। একটি সবুজ পাখি উড়ে এসে বসছে জারুলগাছে,
তাকে আর তীরন্দাজ খুঁজেই পাচ্ছে না। সে কী তবে পাতা
হয়ে গেলো!

শনিবার। বুধবার। দুইদিন দুপুরে সাইকেলে ব্যাগ, বাবা
হাটের দিকে যেতন। বাড়ির সামনে বুড়ো আমগাছ তলায়
দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতাম তার যাবার পথের দিকে। মাটির
সড়কে অল্প ধুলো উড়িয়ে ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছেন বাবা।
তারপর রায়গ্রাম মোড়ে বাঁক নিয়ে উধাও হয়ে যেতেন। ধুলো
ওড়া একটি মাটির সড়ক হয়ে যেতেন

৮.
একা থাকার বিড়ম্বনা এই; ললনারা ভিড় করে আসে

একজন হাতব্যাগ থেকে মধ্যরাতে একটি গোলাপ দিয়ে বলে,
-এই ফুল আপনার, চোখ বন্ধ করে আমার মুখ মনে এনে
সুবাস নিন

পাঁপড়িতে নাক ডুবিয়ে সুবাস নিতে গিয়ে কী কোন কান্না
পেলাম!

বিভ্রান্তির মেঘে বিমানটি ঢুকে পড়েছে আবার। উঠোনে
দাঁড়িয়ে খুব চেষ্টা করে যাচ্ছে আমার বাল্যকাল, তাকে
দেখতেই পাচ্ছে না

ওদিকে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটি নিমন্ত্রণে ডেকেছে আমাকে।
আমি নিজের ছেঁড়া পাকস্থলি সেলাই করছি

৯.
হরর মুভি শেষ। প্রেক্ষাগৃহ থেকে যারা বেরিয়ে এলো ওরা
সবাই কী ড্রাকুলা?

শীতবৃষ্টির রাত। হাওয়া। বাইরে প্রেত্নি হাসছে

ইলেট্রিসিটি নিভে গেলো। অন্ধকার বাড়ি জুড়ে মোমবাতিও
লুকোচুরি খেলে। তাকে খুঁজে পাওয়া গেলে যে দেয়াশলাই
তার দু’একটি কাঠি তা কেবল স্পার্ক করে নিভে যায়

তখন রবীন্দ্রনাথ ফটোফ্রেম থেকে আমাকে ধমকে দিলো,
একটি মোমও জ্বালাতে পারো না! যাও, ওঘরে ‘কংকাল’
গল্পের ডাক্তার মেয়েটি তোমার বিছানায় শুয়ে আছে। ওর
কাছ থেকে শিখে নিও

১০.
একদল জেব্রা গাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। ওদের
শরীরময় জেব্রাচিহ্নগুলো ধরে এরমধ্যে কতবার মহাকাশে
আসছি। যাচ্ছি। পাশ দিয়ে শো শো শব্দে উড়ে যাচ্ছে
নভোযানগুলো। ছায়াপথে একজন হাইওয়ে পুলিশও নেই।
সতর্কতার সঙ্গে সামনে পিছনে দেখছি, আমার এ আসা
যাওয়া কেউ দেখে ফেলেনি তো! তখুনি বউ কিচেন থেকে
চেঁচিয়ে বলছে, বাজারে যাও… এই নাও বাজার ফর্দ
আমি খুঁজছি আমার চশমা… চশমা ছাড়া এই ফর্দের কিছুই
পড়তে আমি পারবো না

১১.
শর্ষেফুলের মাঠে নেমে এসে দুচোখ চড়কগাছ, ঘনিয়েছে
হলুদরাত্রি। যে এসে পড়েছে এই হলুদ ফুলের দেশে বাতাস
তাকেই বলছে, আজ তোমার ‘গায়ে হলুদ’

আতঙ্কে আছি, আমার গোঁফের রং মাথার চুলের রং হলুদ হয়ে
গেলো না তো!

আর ঠিক জানিও না হেঁটে হেঁটে কোথায় যাচ্ছি, পুরো এক
সর্ষেফুলের মৌসুম

১২.
ঘাস খাচ্ছে ডালিমকুমারের ঘোড়া। ধূধূ মাঠ। ডালিমকুমার
কই?

অশ্বত্থ গাছের নিচে মানুষ সমান মাপের একটি পাথর, পাশে
তরবারি পড়ে আছে

ভাবছি, আর ভয়ে পাথর হয়ে যাচ্ছি

১৩.
শালুক পাতা উপর ঘুমিয়েছিলাম। সকালের রোদ এসে ডাক
দিয়ে গেছে

বিস্তীর্ণ ঘাসমাঠ। একটি জেব্রা আর জেব্রাশাবক খেলা করছে
সকালের রোদে

ভাঙা এক হেলিকপ্টার। আকাশে বিধ্বস্ত হয়ে নেমে এসেছিল।
পেটের ভেতর তার মেঠোইঁদুরের বাসা, কাঠবিড়ালির
আস্তানা। ডানায় বসছে ফড়িং, উড়ে যাচ্ছে আবার বসছে,
উড়ে যাচ্ছে ঘুমচোখে দৃশ্যগুলো দেখে ঠিক সম্পূর্ণ সত্য না স্বপ্ন বুঝতে পারছি না

মাথার উপরে নাকি দিঘীর জলের নিচে ভোরমাখা আকাশ!
উড়ে আসছে ধর্মবক। তাকে দেখছি মাথার উপরে আবার
শালুক পাতার নিচে

১৪.
বাদাম ভাঙতে গিয়ে মনে হল, বিকেল ভেঙেছি। না হলে তো
ঝুপ করে বনপথে সন্ধ্যে হতো না

পাখিরা ফিরছে ঘরে; আমিও ফিরতে চাই

শক্ত খোসার মধ্যে বাদামের লাল লাল পাতলা বাকলগুলো
বাতাসে যা উড়িয়েছি। এখন সেসব বাঁশবনে উড়ছে; হয়ে
অজস্র জোনাকি

জোনাকির বনে একা বহুদূর হেঁটে যাই



শেয়ার করুন

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top
error: Content is protected !!